চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আমন মৌসুমে গত কয়েক বছর ধানবীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে কৃষি অঞ্চলের দুই জেলায় বীজ সংগ্রহ কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৬১৬ টন আমন বীজ সংগ্রহ করা হলেও চলতি বছর ৫০০ টন সংগ্রহ করতে পেরেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বছরের ব্যবধানে সংগ্রহ কমেছে ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক মৌসুমের ব্যবধানে বীজ সংগ্রহ কমে আসাকে বড় ব্যর্থতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সময়মতো মূল্য পরিশোধ, প্রণোদনা বা উৎপাদন সহায়তা বাড়ানো না হয়, তবে আগামী মৌসুমগুলোয় বীজ উৎপাদন সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও চুক্তি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে বীজ উৎপাদননির্ভরতা আরো বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের উৎপাদন কমেছে প্রায় তিন লাখ টন। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সার্বিকভাবে আমন উৎপাদন কম হলেও বিএডিসির কৃষি অঞ্চলের দুই জেলায় ধানবীজে প্রভাব পড়েনি। বীজ আবাদসহ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা থাকায় কৃষকের অনীহা বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে বীজ উৎপাদনে।
চট্টগ্রাম বিএডিসির (কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স) তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় আমন বীজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০০ দশমিক ৬০ টন। মৌসুম শেষে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার ৬২ কৃষকের কাছ থেকে প্রায় ৮ জাতের ৩১৩ দশমিক ৫৬ টন ও কক্সবাজার জেলার ২১ কৃষকের কাছ থেকে ৩ জাতের ১৮৭ টন বীজ সংগ্রহ করা হয়। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম থেকে ৫০৭ দশমিক ৫৩ টন ও কক্সবাজার থেকে ১০৮ দশমিক ৪৮ টনসহ ৬১৬ টন সংগ্রহ হয়েছিল। চট্টগ্রামে ১৯৪ টন সংগ্রহ কমলেও কক্সবাজারে ৭৯ টন বীজ সংগ্রহ বেড়েছে।
জাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই জেলার মধ্যে বিআর-১০ জাতের বীজ ৩৩ টন, বিআর-১১ জাতের বীজ ১৩ টন, বিআর-২২ জাতের বীজ ৩০৩ দশমিক ৫০ টন সংগ্রহ হয়েছে। এছাড়া বিআর-২৩ জাতের বীজ ২৪ দশমিক ৮০ টন, ব্রি-৪৯ জাতের বীজ ৫৩ টন, ব্রি-৫১ জাতের বীজ ২২ টন, ব্রি-৫২ জাতের বীজ ১৮ দশমিক ৩০ টন এবং ব্রি-৮৭ জাতের বীজ সংগ্রহ হয়েছে ৩৩ টন। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলা থেকে বিআর-২২ জাতের বীজ ১০২ দশমিক ৬৪ টন, ব্রি-৪৯ জাতের বীজ ১৫ দশমিক ২৪ টন ও ব্রি-৫২ ধানবীজ সংগ্রহ হয়েছে ৯ দশমিক ১৭ টন।
চুক্তিবদ্ধ ৮৩ কৃষক এ বছর ৪৬৭ একর জমিতে ধানবীজ আবাদ করেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ২৯৪ একর ও কক্সবাজারে ১৭৩ একর জমিতে চাষ করা হয়। অথচ গত অর্থবছরে ৯৮ কৃষক ৬৭০ একর জমিতে বীজ আবাদ করেছিলেন। এ বছর কৃষক ও কৃষিজমির পরিমাণ দুটোই কমেছে। চলতি মৌসুমে কৃষকদের বীজের দাম কেজিপ্রতি ৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কৃষকরা বলছেন, সাধারণ ধান ও বীজের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ধানবীজ চাষে আরো বেশি দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ধানের আর্দ্রতা, বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, মানমাত্রা ইত্যাদি পরীক্ষা করে সংগ্রহ করা হয়। যেখানে অনেক সময় পঁাচ টন ধান নেয়া হলেও এক টন ফেরত দেয়া হয়। ধানের দাম পরিশোধেও সময় নেয় এক-দুই মাস। অন্যদিকে বাজারের ক্রেতারা নগদে সাধারণ ধান কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত খরচ, শ্রমিকের উচ্চ মজুরি ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া কৃষকদের বীজ উৎপাদন থেকে বিমুখ করে তুলছে। চাষাবাদের শুরুতেই প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করে দিলে কৃষকের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হতো বলে জানান তারা।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বিএডিসির নিবন্ধিত কৃষক নুরুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে সাধারণ ধানের দাম বেশি। বীজ উৎপাদনে সতর্কতা বেশি থাকার পাশাপাশি বিক্রির পর টাকা পেতে সময় লাগে। ফলে লাভ কমে যায়। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ ও প্রক্রিয়াকরণের ঝামেলা মিলিয়ে বীজ উৎপাদন কৃষকের কাছে তেমন লাভজনক মনে হচ্ছে না। চাষাবাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ধানের দাম নির্ধারণ করতে হবে। চাষাবাদ শুরুর আগে আমাদের প্রতি কেজি ধান কত দাম দেবে সেটা নির্ধারণ করে দিলে চাষ করব কি করব না সে সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমন মৌসুমে বীজ সংগ্রহ হয় ৩৫৯ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯২ টন। তবে ২০১৭-১৮ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংগ্রহ কমে দাঁড়ায় ৩০৮ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পর সংগ্রহ হয় ৫৩৪ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮৭ টন ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৬১৬ টন বীজ সংগ্রহ হয়। তবে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংগ্রহ কমে দাঁড়িয়েছে ৫০০ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৬ টন কম।
বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার প্রদত্ত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন তারা। কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি করা থেকে শুরু করে বীজ সরবরাহ ও সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিএডিসি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে সাধারণ ধান চাষের তুলনায় বীজ ধান চাষাবাদে সতর্কতা বেশি হওয়ায় কৃষক আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। জমি প্রস্তুত, বীজ সংগ্রহ, ধান প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্ন ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা থাকায় কৃষকদের জন্যও কাজটি কঠিন হয়ে পড়েছে।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বিএডিসির সহকারী পরিচালক (কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স) মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে মাঠ থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। এজন্য সংগ্রহ কখনো কখনো কম বা বেশি হয়। কৃষক সাধারণ ধান চাষে বেশি আগ্রহী থাকলেও বীজ উৎপাদনে তেমন উৎসাহী নন। এর পরও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কৃষকদের বুঝিয়ে আমরা চাষাবাদ করাচ্ছি। যদি সরকার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায় আমরা সেভাবে সরবরাহ করতে পারব।’